ইন্টারনেট নয়, সিমও নয়! দিল্লির আন্দোলনে ব্যবহার হল এমন প্রযুক্তি, যা ঘুম কেড়েছে তদন্তকারীদের।পুলিশও ধরতে পারেনি বার্তা! বিক্ষোভে ব্যবহৃত নতুন প্রযুক্তি নিয়ে চাঞ্চল্য।হংকং-ইরানের পর এবার দিল্লি! কী এই রহস্যময় Mesh Messaging Network?ফোনে নেই সিম, নেই ইন্টারনেট— তবুও চলেছে বার্তা আদান-প্রদান! কীভাবে সম্ভব?আন্দোলনের নতুন অস্ত্র? অফলাইন মেসেজিং প্রযুক্তি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা।ব্লুটুথে ছড়িয়েছে বার্তা! কেন এই প্রযুক্তি নজরদারির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ?
দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা বিক্ষোভকে ঘিরে এবার সামনে এসেছে একটি ভিন্নধর্মী প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু বিক্ষোভকারী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য এমন একটি মেশ মেসেজিং (Mesh Messaging) প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন, যেখানে সিম কার্ড, মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেটের প্রয়োজন হয় না। তবে দিল্লির ঘটনায় ঠিক কোন অ্যাপ বা প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এই ধরনের প্রযুক্তিকে Forward Secret Messaging in Ad Hoc Network (FOSAM) বা Mesh Messaging Network বলা হয়। এটি মূলত ব্লুটুথের মাধ্যমে কাছাকাছি থাকা একাধিক ডিভাইসকে সংযুক্ত করে। একটি ফোন থেকে আরেকটি ফোনে বার্তা পৌঁছায়, তারপর সেই ফোন আবার পরবর্তী ফোনে বার্তাটি পাঠিয়ে দেয়। এভাবেই ধাপে ধাপে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়, যাকে Hop-by-Hop Relay বলা হয়।এই ধরনের নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত পরিচিত অ্যাপগুলির মধ্যে Briar, Bridgefy এবং অতীতে FireChat-এর নাম বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসেছে। এই অ্যাপগুলির অনেকগুলিতে ফোন নম্বর বা ইমেল দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করার প্রয়োজন হয় না এবং এগুলি সীমিত দূরত্বে ব্লুটুথ বা স্থানীয় সংযোগ ব্যবহার করে কাজ করতে পারে।
সাধারণভাবে পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থাগুলি মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট পরিষেবার মাধ্যমে যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, যদি আইন অনুযায়ী প্রয়োজন হয়। কিন্তু অফলাইন মেশ নেটওয়ার্কে তথ্য কোনও কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে আদান-প্রদান না-ও হতে পারে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হতে পারে। তবে এটি এমন নয় যে এই প্রযুক্তি সম্পূর্ণ অদৃশ্য বা সব পরিস্থিতিতে তদন্তের বাইরে থাকে। কোনও নির্দিষ্ট ডিভাইস পরীক্ষা করলে বা অন্যান্য ডিজিটাল ফরেনসিক পদ্ধতিতে কিছু তথ্য পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেশ নেটওয়ার্কে যত বেশি ব্যবহারকারী যুক্ত থাকেন, বার্তা তত দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। প্রতিটি ডিভাইস সাময়িকভাবে একটি রিলে পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। তাই একটি ফোনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও, মাঝখানে থাকা একাধিক ফোনের মাধ্যমে বার্তা গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে।এই প্রযুক্তি নতুন নয়। ২০১৯ সালে হংকংয়ের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে এবং ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার সময় ইরান ও মিয়ানমারের কিছু আন্দোলনেও অনুরূপ প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সময় Bridgefy-এর মতো অ্যাপের ডাউনলোড উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
তবে মনে রাখা জরুরি, মেশ নেটওয়ার্ক একটি বৈধ যোগাযোগ প্রযুক্তি, যার ব্যবহার শুধুমাত্র আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা, দুর্গম এলাকা বা জরুরি পরিস্থিতিতেও এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে, যেখানে সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করে না।দিল্লির বিক্ষোভে এই প্রযুক্তি কতটা এবং কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, তা নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলছে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত সব দাবিকেই সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।